সীগাল এর মৃত্যু অতঃপর জাহাজে-মেরিন অফিসার মনি

মহসিন হাসান মনিঃ-

জাহাজে জয়েন করার পরে কাজের ফাঁকে ফাঁকে প্রিয়জনদের কথা মনে করতে করতে ভালই দিন কেটে যাচ্ছিল মনি’র। মনি কিছুদিন হলো জাহাজে জয়েন করেছে। জাহাজের সবকিছুই তার কাছে নতুন মনে হয়। যা দেখে সেটাই তার কাছে আজব লাগে। আসলে আজব লাগারই কথা। প্রথম জাহাজ বলে কথা।একদিন দুপুরের পরে কাজে যাচ্ছিল মনি।হঠাৎ দেখল জাহাজের এক কোনায় একটি সাদা শুভ্র সী-গাল শুয়ে আছে। কিন্তু পাখিকে কখনো এভাবে শুয়ে থাকতে দেখে নি মনি। ভাবল জাহাজে মনে হয় পাখি এভাবেই শুয়ে থাকে।যাহোক, সে ধীরে ধীরে পাখিটির কাছে গেল। দেখল যে পাখিটির কোন নড়াচড়া নেই।

মনের ভিতর একটা সন্দেহ দানা বাঁধে। একটা কাঠ দিয়ে আওয়াজ করলো মনি। পাখিটির কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। মনি আরও কিছুটা এগিয়ে যায়। খুব সতর্কতার সাথে আরও কাছে গিয়ে দেখতে পায়, লাল পিপড়া পাখির পা বেয়ে চোখ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। বুঝতে আর বাকি রইলোনা পাখিটি মারা গেছে। তারপর দুই হাতে হাত মোজা পরে পাখিটির পা শক্ত করে ধরে ধীরে ধীরে উপরের দিকে হাঁটতে শুরু করল মনি। উপরে জাহাজের কমান্ড কন্ট্রোল সেন্টার যা কিনা ব্রিজ নামে পরিচিত সেখানে গিয়ে ক্যাপ্টেনকে মৃত পাখিটি দেখালো। ক্যাপ্টেন পাখিটি দেখামাত্র চিৎকার করে উঠল, “কে মেরেছে পাখি”? মনি কিছুটা ভরকে গেল। পাখিটা কে মেরেছে তা মনি জানে না। আর জাহাজে সাধারণত কেউ পাখি শিকার করে না।মনি শান্ত গলায় উত্তর দিল, স্যার জানিনা। কেউ মারেনি পাখিটিকে। ক্যাপ্টেন: তাহলে এটা মারা গেল কিভাবে?মনি: জানি না স্যার এটাকে ওই পিছন দিকটা তে মরে পড়ে থাকতে দেখেছি। ক্যাপ্টেনের মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেল। আনমনে কি যেন ভাবতে লাগলো। নিজের অজান্তেই মনে হলো, বিড় বিড় করে বললো, “এটা কোন ভাল লক্ষন না”। কথাটা মনি’র মনে গেঁথে গেল। ” এটা কোন ভাল লক্ষন না”। জাহাজে “Old Seamanship” বলে একটা কথা আছে। যাহোক মনি জিজ্ঞেস করলো, স্যার পাখিটা কি করবো? ক্যাপ্টেন: কি করবে? এটাকে নিয়ে পানিতে ফেলে দাও। কিন্তু এটা কোন ভালো লক্ষণ না। মনি পাখিটাকে হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে নিচে গেল। নিচে গিয়ে পাখিটি পানিতে ফেলে দিল। কিন্তু ক্যাপ্টেনের এই কথাটি মনে গেঁথে রইল, এটা কোনো ভালো লক্ষণ না।এর কিছুদিন পরে চাকুরীর মেয়াদ শেষের পূর্বেই, অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ক্যাপ্টেন স্যার কে অপসারণ করলো কোম্পানি। মনির মনে সেই পাখির মৃত্যুর কথা মনে পড়ে গেল, এটা কোন ভাল লক্ষন না। কিন্তু মনি তখনো জানতো না, এর থেকেও আরো খারাপ কিছু অপেক্ষা করছে সামনে।নতুন ক্যাপ্টেন জয়েন করলো। জাহাজ মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন পোর্ট থেকে প্রায় ১০ হাজার মেট্রিক টন সেগুন গাছের গুড়ি নিয়ে ইন্ডিয়ার মুম্বাইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল পশ্চিমে এবং শ্রীলঙ্কা থেকে ৭৫০ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণ-পূর্বে জাহাজ। আজ মনি’র মন ভালো নেই। কিছুক্ষণ আগে জাহাজের সিনিয়র অফিসারের সাথে কিছুটা মনমালিন্য হয়েছে তার। হবে নাই বা কেন? জাহাজের জুনিয়ার অথবা শিক্ষানবিস ক্যাডেটকে সবাই গনিমতের মাল মনে করে। সবাই সবার কাজ করানোর চেষ্টা করে। প্রতিদিন টানা ১২ থেকে ১৪ ঘন্টা ডিউটি, তার উপরে মানসিক কষ্ট। সবমিলিয়ে একটা প্রতিকূলত অবস্থা। দুপুরে লাঞ্চ করে বিশ্রাম নিচ্ছিলো মনি।এরই মাঝে জাহাজে ফায়ার এলার্ম বেজে উঠলো। জাহাজের ইঞ্জিনে আগুন লেগেছে। সবাই ইঞ্জিন রুমের দিকে ছুটে গেল অগ্নি নির্বাপনের জন্য।

ইঞ্জিন রুমে প্রচন্ড ধোয়া এবং অন্ধকার। ব্ল্যাক আউট হয়ে গেছে। জাহাজের কারেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। প্রায় আধা ঘণ্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসলো। সবকিছু স্বাভাবিক হলো। কিন্তু ইঞ্জিন স্বাভাবিক হলো না। আগুনের সূত্রপাত ইঞ্জিনের ক্রান্কশ্যাফট এ বিস্ফোরণ থেকে। জাহাজের ইঞ্জিনিয়ারগন অনেক চেষ্টা করেও রিপেয়ার করতে পারলো না। জাহাজের ক্যাপ্টেন নিরুপায় হয়ে অফিসকে জানালো এবং এই জাহাজ বন্দরে নিয়ে যাওয়ার জন্য অন্য আরেকটি জাহাজের সাহায্য চাইলেন।প্রকৃতির কাছে আমরা কতটা অসহায় মনে পড়ে গেল মনি’র। এত বিশাল জাহাজ আজ শুধুমাত্র বাতাস এবং পানির অনুকূলে ভেসে যাচ্ছে। জাহাজের নাবিকদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই জাহাজের উপরে। আজ চারদিন পরে উদ্ধারকারী জাহাজ তথা টাগবোট এসে পৌঁছেছে। আবহাওয়া অনুকূলে ছিল না। উদ্ধারকারী টাগবোট জাহাজ নিয়ে রওনা দিলো ইন্ডিয়ার মুম্বাই পোর্ট এর উদ্দেশ্যে। ইন্ডিয়ান পোর্ট এই জাহাজ তাদের জলসীমায় ঢোকার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দিল। কারণ একটাই, জাহাজের ইঞ্জিন ভালো নেই। অবশেষে শ্রীলংকার কলম্বো পোর্ট, পোর্ট অফ রিফিউজি এর অধীনে, তাদের জলসীমায় ঢোকার অনুমতি দিল। জাহাজের ঠাঁই হলো, কলোম্বো বন্দরের বহির্নোঙরে। এই বহির্নোঙ্গরে প্রায় ১০২ দিন থাকতে হয়েছিল জাহাজের নাবিকদের। এই জাহাজের ইঞ্জিন আর মেরামত করা সম্ভব হয়নি। জাহাজটিকে জাহাজের মালিক বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছিল।জাহাজটি স্ক্রাপ করার উদ্দেশ্যে কেনা সত্ত্বেও, জাহাজের নতুন মালিকের অভিজ্ঞতা খুবই তিক্ত। জাহাজটির কার্গো, কলম্বোতে খালাস করা হয়। অতঃপর জাহাজটি পুনরায় নাবিক বিহীন শুধুমাত্র টাগবোট এর সহায়তায়, এর গন্তব্যে নিয়ে যাওয়ার জন্য কলম্বো বন্দর ত্যাগ করে। কিন্তু পথিমধ্যে এই জাহাজটি পুনরায় ঝড়ের কবলে পড়ে। টাগবোট থেকে জাহাজটি বিচ্যুত হয়ে যায়। অবশেষে ভারতের একটি সি বিচে গিয়ে আটকে যায় জাহাজটি। ১৫ দিন যাবত আটকে ছিল জাহাজটি। এই ঘটনাগুলোর সাথে কাকতালীয়ভাবে মনি আজও সেই ক্যাপ্টেনের কথা, আর পাখির মৃত্যুর ঘটনা গুলিয়ে ফেলে।ক্যাপ্টেন ঠিকই বলেছিল, জাহাজে পাখির মৃত্যু-“এটা কোন ভাল লক্ষন না”।

One thought on “সীগাল এর মৃত্যু অতঃপর জাহাজে-মেরিন অফিসার মনি

  1. ঘটনাটি হৃদয়বিদারক। আমরা ইন্টারমিডিয়েট এ The Ancient Mariner একটা প্রবন্ধ পড়েছিলাম। Albatross পাখি নিয়ে ঘটনাটি। অশুভ লক্ষ্মণ নিয়ে বর্ণিত হয়েছিল সেখানেও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *